Health

চুল পড়ার সমস্যা ও তার ঘরোয়া সমাধান, চুলের প্রত্যেক সমস্যার জেনে নিন সহজ উপায়!

মানুষের সৌন্দর্যের অন্যতম একটি প্রতীক হলো কেশরাশি। তবে বর্তমানে চুল পড়ার সমস্যা রয়েছে প্রত্যেকের। বিশেষ করে বর্ষাকালে চুল পড়ার সমস্যা আরও গভীর হয়। অনেকেই অনেক রকম ডাক্তার দেখিয়ে ভুরি ভুরি ওষুধ খেয়ে কোনরকম লাভ পায়না। তবে আজকের এই প্রতিবেদনে খুব সহজে কিছু ঘরোয়া উপায় বলা হবে যেগুলি আপনি ফলো করলে আপনার চুল পড়া সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে পারবেন। তবে তার আগে চুল পড়ার কারণ সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। বিভিন্ন কারণে চুল পড়ে থাকে প্রত্যেকটির কারণ ও প্রতিকার আলাদা।

আপনার চুল কি গোড়া থেকে মজবুত হতে হবে। আর তার জন্য আপনার চুলের সমস্যা নাকি স্ক্রাবের সমস্যা সেটি আগে ভালো করে জানতে হবে নাকি কোন অন্তর্নিহিত রোগের জন্য চুল পড়ছে সে ব্যাপারটি বের করতে হবে।

স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেকদিন মানুষের কিছু চুল পড়ে থাকে তবে কোনটি সাধারণ এবং কোনটি অস্বাভাবিক সেটি আপনাকে বুঝতে হবে। প্রত্যেকদিন আমাদের ৫০ থেকে ১০০ টি চুল সাধারণত ঝরে পড়ে যায়। এটি স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে। কারণ কিছু চুল গজায় নতুন করে এবং কিছু ঝড়ে পড়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি দেখেন বিছানায় চুলের গোছা রয়েছে, চুল আঁচড়াতে গিয়ে অনেক পরিমাণ চুল উঠে আসছে, শ্যাম্পু করলে প্রচুর চুল ঝরে যাচ্ছে, আপনার চুল আগে থেকে পাতলা হয়ে যাচ্ছে, টাক দেখা যাচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে এটি আপনার স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আপনার চুলের যত্ন নেওয়া খুব দরকার।

চুল পড়ার কারণসমূহ:

বিভিন্ন কারণে চুল পড়ে থাকে। এর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি কারণ আলোচনা করা হলো।

১) পুষ্টির ঘাটতি: আমাদের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সমন্বয় থাকা জরুরী। যদি কোন একটি উপাদান বেশি কম হয় তাহলে তা আমাদের স্বাস্থ্যের যেমন ক্ষতি করে ঠিক তেমনি চুলের সমান ক্ষতি হয়। আয়রন, প্রোটিন, বায়োটিন, জিঙ্ক এবং ভিটামিন ডি ও বি১২ প্রত্যেক দিনের খাদ্য তালিকায় সমান পরিমাণে থাকা উচিত। এগুলির কম বা অভাব হলে সেটি চুলের ওপর প্রভাব ফেলে যার ফলে চুল দুর্বল হয়ে যায় এবং খুব সহজে ঝরে পড়ে যায়।

২) হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: আমাদের শরীরে বিভিন্ন সময় হরমোনের ওঠা নামা হয়ে থাকে। তার মধ্যে প্রধান হলোকর অবস্থা, পিসিওএস, থাইরয়েড এবং মেনোপজের সময় বিশেষ করে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে চুলের বৃদ্ধি নষ্ট হয় এবং চুলের গোড়া আলগা হয়ে যায়। খুব বেশি পরিমাণে চুল উঠতে থাকে।

৩) মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব: প্রত্যেকদিন ৬-৭ ঘন্টা ঘুম দরকার। ঘুমের যদি অভাব হয় অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যদি পর্যাপ্ত ঘুম না হয় তাহলে যেমন তার প্রভাব শরীরের এবং স্কিনের পড়ে ঠিক তেমনি চুলে ও এর প্রভাব পড়ে।

 এছাড়া মানসিক চাপ চুলের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে।

৪) দূষণ কঠিন জল: অনেক সময় অনেক ক্ষার বেশি থাকার জল বা দূষিত জল দিয়ে যদি আপনি স্নান করেন তাহলে জলে থাকা ক্ষারীয় পদার্থ বা খনিজ পদার্থ আপনার চুলের গোড়ায় জমা হয়ে চুলকে ভঙ্গুর করে দেয় এবং চুলকে বৃদ্ধি পেতে বাধা প্রদান করে।

৫) তাপীয় স্টাইলিং এবং রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট: বর্তমানে আধুনিক যুগে অত্যাধুনিক রাসায়নিক দ্রব্য এবং ইলেকট্রনিক্স এর মাধ্যমে চুল স্ট্রেট করা এছাড়া ব্লো ড্রাই ইত্যাদি ঘনঘন করায় চুলের গোড়া আলগা হয়ে যায় যার ফলে অত্যাধিক চুল ঝরে পড়ে।

৬) চুলের যত্নের পণ্যের ভুল নির্বাচন: আপনি যদি অত্যাধিক সালফেট যুক্ত শ্যাম্পু বা সিলিকনযুক্ত কন্ডিশনার অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করেন তাহলে সেটি আপনার চুলের আদ্রতা থেকে নষ্ট করে দেয় ফলে অতিরিক্ত চুল ঝরে যায়।

চুলের সমস্যায় ঘরোয়া প্রতিকার:  আপনার যদি চুলের সমস্যা থাকে তাহলে নিম্ন নিয়ে আলোচনা করা ঘরোয়া প্রতিকারগুলি আপনার উপকারে আসতে পারে।

১) নারকেল তেল : নারকোল তেল একটি অত্যন্ত উপাদানীয় দ্রব্য। নারকেল তেল মাথার ত্বকে পুষ্টি যোগান দেয়। এটি চুলের একদম গভীরে প্রবেশ করে। আপনি যদি নারকেল তেলকে একটুখানি উষ্ণ করে মেসেজ করতে পারেন তাহলে মাথার ত্বকের রক্ত সঞ্চালন বাড়বে এবং চুলের গোড়ায় খুব দ্রুত পুষ্টি পৌঁছাবে। এরপরে চুলের গোড়া মজবুত হবে এবং চুল অনেক কম পড়বে।

ব্যবহার পদ্ধতি: দুই থেকে তিন টেবিল চামচ নারকেল তেল হালকা গরম করে নিন। এরপর আপনার মাথার ত্বক ১০ মিনিট আলতো করে ম্যাসাজ করুন। ৩০ মিনিট থেকে এক ঘন্টা পর ময়েশ্চারাইজিং শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলুন।

২) কারি পাতার তেল: কারি পাতায় প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন ও প্রোটিন থাকে। এটি চুলের ঘনত্ব বাড়াতে চুলের পুষ্টি যোগাতে খুব সাহায্য করে। কিছু সতেজ কারি পাতা তুলে সেদিন নারকেল তেলের মধ্যে ফুটিয়ে নিন যতক্ষণ না তেলটি কালো হচ্ছে। এরপর তিনটি ছেঁকে নিয়ে ব্যবহার করুন। মাথার ত্বকে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। সপ্তাহে দুই দিন অন্তত ব্যবহার করুন। সারা রাত রাখতে পারেন বা কয়েক ঘণ্টাও রাখতে পারেন।

৩) চাল ধোয়া জল: চাল ধোয়া জলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন এবং ইনোসিটল রয়েছে, যা চুলের ক্ষতি মেরামত করে এবং চুলকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

ব্যবহার পদ্ধতি: আধা কাপ চাল ধুয়ে ২ কাপ জলে ত্রিশ মিনিটের জন্য ভিজিয়ে রাখুন। এরপর এটি ছেঁকে নিন। শ্যাম্পু করার পর যখন শেষবার চুল ধোবেন তার ঠিক আগে এই দলটি দিয়ে মাথার চুল ধুয়ে ফেলুন। ১০ মিনিট রেখে দিয়ে তারপর আবার ভালো জল দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে এক থেকে দুইবার এইভাবে ব্যবহার করুন।

৪) পেঁয়াজের রস: পেঁয়াজের রস চুল পড়া রোধের একটু অনবদ্য উপাদান। পেঁয়াজের রসে সালফার থাকে। এটি চুলের ত্বক ভালো রাখতে এবং চুলের গোড়া মজবুত করতে সাহায্য করে।

পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিয়ে পেঁয়াজের টুকরোগুলো ব্লেন্ড, গ্রেট বা জুস করে নিন। এরপর একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মণ্ডটি ছেঁকে নিন অথবা চালুনি দিয়ে চেলে রস বের করে নিতে হবে। এরপর এই রস মাথার ত্বকে সপ্তাহে একবার ব্যবহার করুন।

৫) জবা ফুল পাতার প্যাক:  জবা ফুল ভিটামিন সি, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং আলফা-হাইড্রক্সি অ্যাসিড রয়েছে। এটি চুলের পুষ্টি যোগায়, চুল পড়া রোধ করে। এছাড়া নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।

একটি ভালো ও তাজা জবা ফুল ও তার পাতা বেটে একটি পেস্ট তৈরি করুন। এই পেস্টের সাথে আপনি নারকেল তেল মেশাতে পারেন। এটি মাথার ত্বকে ও চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিন। সপ্তাহে একবার ব্যবহার করুন তাহলে উপকার বুঝতে পারবেন।

৬) কেশসজ্জা:  টেনে চুল বাঁধা, খোঁপা করা, ক্লিপ পরা, বিনুনি এগুলি করলে চুলের গোড়ায় অস্বাভাবিক টান পড়ে। এরপরে চুলের গোড়া ক্ষতি করতে হয় এবং কিভাবে আলগা হয়ে যায়। তাই চেষ্টা করবেন একটু হালকাভাবে চুল বাঁধতে।

৭) মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা: মানসিক চাপ আপনার চুলের ক্ষতি করে যেহেতু তাই চেষ্টা করবে মানসিক চাপ কম রাখতে। চেষ্টা করবেন ধ্যান, যোগাসন, আপনার পছন্দের গান শোনা বা পছন্দের কাজকর্ম করতে যাতে আপনার মন ভালো থাকে।

৮) এছাড়া কোন ধূলো বালির জায়গা থেকে আসলে চেষ্টা করবেন শ্যাম্পু করে নিতে কারণ অত্যাধিক ধুলোবালি আপনার চুলের ত্বকের গোড়ায় জমে গিয়ে ত্বকের ক্ষতি করে।

এই সমস্ত ঘরোয়া উপাদানগুলি আপনার চুল পড়ার সমস্যা থেকে অনেকটাই রেহাই দেবে আপনাকে। এরপরও যদি কোন ভাবে আপনার চুল পড়া না কমে তাহলে অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।

স্বাস্থ্যই সম্পদ এ কথাটা যেমন রয়েছে তার পাশাপাশি চুল সৌন্দর্যে অন্যতম প্রতীক। তাই চুল পড়া কি কখনো অবহেলা না করে ঘরোয়া প্রতিকার করার চেষ্টা করুন আর তাতেও যদি আপনার না কমে চুল পড়া তার অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button